দক্ষিণ পূর্ব

রাত পোহালেই ডাকসু নির্বাচন

মনির ফয়সাল
মনির ফয়সাল
প্রকাশ : ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
পঠিত :
রাত পোহালেই ডাকসু নির্বাচন
দক্ষিণপূর্ব ডেস্ক

রাত পোহালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলবে ভোটগ্রহণ। আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে রোববার (৭ সেপ্টেম্বর)। ফলে গত কয়েক দিনের প্রচারণার কোলাহলমুখর ক্যাম্পাস এখন স্তব্ধ। শিক্ষার্থীরা তাই চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে হল-করিডোরে এখন ভোটের দিন নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনায় মগ্ন।

এদিকে নির্বাচন ঘিরে নতুন এক আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। শিবির ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার ফেসবুক আইডি হঠাৎই নিষ্ক্রিয় (ডিসেবল) হয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে তারা প্রচারণার শেষ পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে পারেননি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ এটিকে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বললেও, অন্যরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ হতে পারে বলে মন্তব্য করছেন। এ ছাড়া নির্বাচন আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারের সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের জন্য ডাকসু নির্বাচন একটি বার্তা হতে পারে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন। 

শিক্ষার্থীরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর ডাকসুর ভোট ঘিরে তারা ভীষণ উচ্ছ্বসিত। কারণ, এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন নেতৃত্ব আসবে, যা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও সামাজিক পরিবেশ আরও প্রাণবন্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এবারের ভোটের ১৩ দিনের প্রচারণায় দেখা গেছে সৃজনশীলতা-কৌশল। এবার সবচেয়ে স্বতঃস্ফূর্ত ডাকসু নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন প্রার্থী ও ভোটাররা। প্রচারণায় তাই বাড়তি চেষ্টা দেখা গেছে প্রার্থীদের। টাকা, ডলার, রিয়াল, লিগ্যাল নোটিশ, খাম, মানচিত্র, এটিএম কার্ড, ভিজিটিং কার্ড, হাতপাখা, বুকমার্ক ইত্যাদির আদলে হ্যান্ডবিল, লিফলেট ও পোস্টার ছাপিয়েছেন প্রার্থীরা। এমনকি সিগারেটের প্যাকেটের আদলেও ছিল কার্ড। প্রায় ১৫শ’ প্রার্থী। উৎসবের আমেজে হয়েছে প্রচারণা। হল পাড়াতে এই আমেজ ঢের বেশি। অল্প সময় পরপর ভোটারদের রুমে সদলবলে উপস্থিত হয়ে ভোট চাইতে দেখা গেছে প্রার্থীদের। কেউ কেউ প্রচারণা করেছেন প্যারোডি গানের সুরে সুরে। 

প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. জসীম উদ্দিন একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের মনে এখনো প্রশ্ন, ভোটের দিন পরিস্থিতি কতটা শান্তিপূর্ণ থাকবে এবং শেষ মুহূর্তে কোন প্রার্থীরা এগিয়ে যাবে।

ডাকসুর ২৮টি পদের বিপরীতে মোট ৪৬২ জন প্রার্থী লড়ছেন। এর মধ্যে ভিপি পদে ৪৮, জিএস পদে ১৯ এবং এজিএস পদে ২৮ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন, স্বতন্ত্র প্যানেল এবং জোটের প্রার্থীরা আলোচনায় রয়েছেন।

ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল থেকে ভিপি পদে আবিদুল ইসলাম খান, জিএস পদে শেখ তানভীর বারী হামিম এবং এজিএস পদে তানভীর আল হাদী মায়েদ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।  

অন্যদিকে, ছাত্রশিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের প্যানেল থেকে ভিপি পদে আবু সাদিক কায়েম, জিএস পদে এসএম ফরহাদ এবং এজিএস পদে মহিউদ্দিন খান আলোচনায় রয়েছেন। এই দুটি প্যানেলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিক প্যানেলের বাইরে স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী শামীম হোসেনও শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন।

এছাড়া গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল থেকে ভিপি পদে আবদুল কাদের এবং জিএস পদে আবু বাকের মজুমদার লড়ছেন। জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মাহিন সরকার শেষ মুহূর্তে আবু বাকের মজুমদারকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোয় এই প্যানেলটি আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ প্যানেল থেকে ভিপি পদে উমামা ফাতেমা, ছাত্রঅধিকার পরিষদ থেকে ভিপি পদে বিন ইয়ামিন মোল্লা এবং বামপন্থী শিক্ষার্থীদের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ থেকে ভিপি পদে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি এবং জিএস পদে মেঘমল্লার বসু লড়ছেন।

নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯,৭৭৫ জন, যার মধ্যে ছাত্র ভোটার ২০,৮৭৩ এবং ছাত্রী ১৮,৯০২ জন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ৮টি কেন্দ্রের ৮১০টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গ্রহণ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলবে। বিকাল ৪টার মধ্যে ভোটকেন্দ্রে লাইনে থাকা শিক্ষার্থীরাও ভোট দিতে পারবেন। 

এদিকে নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ নিয়ে শেষ মুহূর্তে তিনটি জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘সোচ্চার’, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সংগঠন ‘ন্যারেটিভ’, ও ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ’ জরিপ চালিয়েছে শিক্ষার্থীদের মাঝে। দুটিতে ব্যাপক ব্যবধানে জয়ী হতে দেখা গেছে শিবির সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটকে’ একটিতে আছে ২য় অবস্থানে। যদিও এ জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। শিক্ষার্থীদের মতামত নেয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। জরিপ পরিচালকরা বলছেন, মতামত সংগ্রহের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব রক্ষা করা হয়েছে। এককভাবে কোনো মতাবলম্বী কারও মতামত নেয়া হয়নি। একাধিক স্থান, কাল ও পারিপার্শ্বিকতার ভোটারদের কাছ থেকে নেয়া হয়েছে মতামত। এদিকে প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী এখনো ঠিক করেননি কাকে ভোট দেবেন। অনাবাসিক শিক্ষার্থী প্রায় অর্ধেক। ফলে এই শহুরে মধ্যবিত্ত অনাবাসিক ভোটারদের ভোট কার কাছে যাবে তাই হবে জয়-পরাজয়ের মূল কারণ।

সরেজমিনে ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, প্রচার-প্রচারণা শেষ হলেও প্রচারণার রেশ এখনো টের পাওয়া যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন প্রার্থীর পোস্টার। টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন ও হলগুলোতে শিক্ষার্থীরা দলবদ্ধ হয়ে বসে আলোচনা করছে আগামীকালের ভোট নিয়ে। কে কোন পদে এগিয়ে, কার সম্ভাবনা বেশি- এসব নিয়ে চলছে তর্ক-বিতর্ক। ক্যান্টিনের আড্ডায়ও আজ (সোমবার) মূল আলোচনার বিষয় নির্বাচন। অনেকে আবার ভোটের দিন কীভাবে লাইনে দাঁড়াবেন, কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন এসব নিয়েই সরব।

হলগুলোতে প্রার্থীদের প্রচারণা বন্ধ হলেও চুপ নেই তাদের সমর্থকরা। তারা নিজেদের সংগঠনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের একজোট করার চেষ্টা করছেন। তবে প্রচারণা শেষ হওয়ায় এখন সবকিছু অনেকটাই শান্ত, আর সেই শান্ত পরিবেশে লুকিয়ে আছে ভোটপূর্ব উত্তেজনা।

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, প্রচারণা চলাকালে পুরো ক্যাম্পাসে যে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটা উপভোগ করেছি। আশা করি, সুষ্ঠুভাবে ভোট হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক চর্চার দারুণ দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। অনেক প্রতিশ্রুতি আমরা শুনেছি। এবার দেখতে চাই কে বাস্তবে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে পারে। তাই আমরা সবাই দায়িত্বশীলভাবে ভোট দেবো।

এরইমধ্যে ভোটের দিন ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

এমএইচএফ

নিউজলেটার

সর্বশেষ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে সাবস্ক্রাইব করুন।