নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দিন দিন প্রভাব বাড়ছে হেফাজত ইসলামের। নিজেদের অরাজনৈতিক আখ্যা দিয়ে শাপলা চত্বরে জমায়েতের মাধ্যমে রাতারাতি সারাদেশের মানুষের দৃষ্টিতে আসা ধর্মভিত্তিক এই সংগঠনটির নেতারাও এখন রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে সচেষ্ট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মাঠে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চায় দলটি। বিশেষ করে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, পটিয়া, ফটিকছড়ি ও বাঁশখালী আসনে তারা হতে চায় ‘কিংমেকার’। নির্বাচনে এই চারটি আসনে তাদের পরোক্ষ প্রভাব থাকবে। ২০১০ সালে হেফাজতে ইসলাম একটি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাদের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি বলে দাবি করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। যদিও প্রথম থেকে ইসলামিপন্থী গ্রুপটি নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন দাবি করলেও ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফতে মজলিস ও নেজামী ইসলামসহ বিএনপি জোটের একাধিক ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতারাই ছিলেন এ সংগঠনের সামনের সারির নেতা।
সংগঠনটির ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, হাটহাজারী মাদ্রাসাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রামে সংগঠনটির নেতারা ইসলামপন্থী ভোটারদের একত্রিত করার পরিকল্পনা করছেন। হাটহাজারী, পটিয়া, ফটিকছড়ি ও বাঁশখালী আসনে ভালো ভোটব্যাংক আছে বলে মনে করছেন তারা। যদিও হেফাজতের রাজনৈতিক কৌশল বরাবরই পরোক্ষ। তারা সরাসরি প্রার্থী দেয় না, তবে আলেমদের মাধ্যমে সমাজে একটি শক্তিশালী ধর্মীয় প্রভাব তৈরি করে রেখেছে। নির্বাচনের সময় সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থনের ইঙ্গিত দিলে, তা স্থানীয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
হেফাজতের চট্টগ্রামের এক সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সংগঠনের ব্যানারে হেফাজত ইসলামের কেউ নির্বাচনে অংশ নেবে না। তবে চট্টগ্রামে জনগণের সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্ক মজবুত। যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারে, তাহলে অন্তত চারটি আসনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব।
জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগবিহীন বাংলাদেশে ধর্মীয় সংগঠন হেফাজত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। দেশের ইসলামপন্থি মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় এই সংগঠনের নেতারা বর্তমানে হিসাব মিলাচ্ছে ভোটের, নির্বাচনের। ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক ও আলোচনায় বসছেন। এককথায় ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল না হয়েও এই সংগঠন এখন পুরোদস্তুর রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দেশের রাজনৈতিক মাঠে।
কওমী অঙ্গনে নিজেদের শক্ত অবস্থানের জন্য তারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামীর কাছে। একসময় দূরত্ব থাকলেও আওয়ামী লীগের অত্যাচার, নির্যাতনকালীন সময়ে কওমী আলেমদের সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াত নেতাদের সখ্যতা গড়ে উঠে। যদিও স¤প্রতি জামায়াতের কড়া সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছেন হেফাজতের আমির মহিবুল্লাহ বাবুনগরী। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি হেফাজতে ইসলামকে কাছে টানার চেষ্টা করছে। গত ১ আগস্ট বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নজরুল ইসলাম চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন হাটাহাজারী মাদ্ররাসায় গিয়ে হেফাজতের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) গুরুত্ব দিচ্ছে এই ইসলামিক প্লাটফর্মকে।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে আমাদের হাজারো নেতাকর্মী শহীদ হয়েছে। কিন্তু আওয়ালীগের ইসলাম বিদ্বেষী ও দেশ বিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেনি। জুলাই অভ্যুত্থানেও প্রকাশ্যে গুলির মুখে দাঁড়িয়েছিল আমাদের ভাইরা। পুরো আওয়ামী দুঃশাসন মোকাবিলায় হেফাজতে ইসলাম রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছে হেফাজত ইসলামের জন্য ও এই দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য নিবেদিত সংগঠন।
নির্বাচনের বিষয়ে আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তবে বিভিন্ন ইসলামিক রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে কাজ করছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে কেউ প্রার্থী হবে না। দেশের প্রচলিত আইন ও নিয়ম মেনে রাজনৈতিক দলের ব্যানারে কিংবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে যে কেউ নির্বাচন করতে পারে। তবে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণের লক্ষ্যে সকল ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য যদি হয় এবারের ভোটের মাঠ অন্যরকম হবে। কে কোন আসনে কাজ করবে তা এখনই বলার সময় আসেনি। তবে জেনে রাখা ভালো চট্টগ্রামের মাটি বরাবরই ইসলামী শক্তির জন্য উর্বর।
এমএইচএফ