মোহাম্মদ আবুল কাশেম
জুলাই আন্দোলনে চাকুরি ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কলম সৈনিকের ন্যায় ভূমিকাসহ নানাভাবে শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলাম। আন্দোলনে আমার কিছু অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি নিয়ে এই লেখা।
চাকুরিসহ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চট্টগ্রামের মুরাদপুর, ষোলশহর, ২নং গেইট এলাকায় আন্দোলনের কর্মসূচিতে জনতার কাতারে সীমিত আকারে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলাম।
মুরাদপুর বিক্ষোভ সমাবেশের বেদনাদায়ক স্মৃতি: ১৬ জুলাই বিকালে মুরাদপুর মোড়ে ফুট ওভার ব্রীজের ওপর উঠে চারদিকের পরিস্থিতি নজর রাখছিলাম। মোবাইলে দু/একটি ভিডিও ক্লিপ নিয়ে নামতেই হঠাৎ বেলাল (রা.) মসজিদ সংলগ্ল বিল্ডিংয়ের ছাদের ওপর থেকে আন্দোলন প্রতিহতকারীরা বৃষ্টির মতো ইট পাথরের টুকরো নিক্ষেপ করলে দৌঁড়ে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণের সময় পিছলে পড়ে পা ও কোমড়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলাম । বাসায় ফিরে এসে কাউকে কিছু না বলে প্রাথমিক চিকিৎসার নিয়েছিলাম। সেদিন মুরাদপুরে সন্ত্রাসীদের নির্বিচার গুলিতে মারাত্নক আহত হয়ে হাসপাতালে ফয়সাল আহমদ শান্ত, ওয়াশিম আকরামসহ তিন জন শাহাদাত বরণের হ্রদয় বিদারক ঘটনা ঘটেছিল।
ফেসবুকে বিপ্লবী লেখালেখি: সরকারি চাকুরিতে নিয়োজিত থাকাবস্থায় চাকুরি হারানোর ভয় উপেক্ষা করে আন্দোলনের পক্ষে তথা স্বৈরাচার সরকারের অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগ গণগ্রেফতার, গণহত্যা ইত্যাদি বেআইনী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে স্টাটাস পোস্ট, শেয়ার, কমেন্টস দ্বারা আন্দোলনের স্পিরিট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িতে দিতে কলম সৈনিকের ন্যায় ভুমিকা পালন করেছিলাম।
২৪-এর ৯ জুন- ৪ আগস্ট বিজয়ের আগ পর্যন্ত এহেন কয়েকটি প্রতিবাদী স্ট্যাটাস স্মৃতিচারণের নিমিত্তে উল্লেখ করছি:
১। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটাবিরোধী মানবনন্ধন। বাতিল হওয়া কোটা ফের পুনর্বহাল অযৌক্তিক। (৯ জুন,২৪ ইং)
২। দেশে কোটাবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে।বিরাট বৈষম্যের কোটা ৫৬% থেকে কমিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটা (শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য, নাতি-নাতনি নয়), প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্টি, সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২০% কোটা আর ৮০% মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকুরির বাজার উম্মুক্ত হওয়া উচিত। ১০% জেলা কোটা থাকতে পারে। রেলওয়ের চাকুরিতে রেলওয়ের পোষ্যকোটা সম্পূর্ণ বাতিল করা উচিত। দ্রুত বিষয়টি নিস্পত্তি হওয়া অতীব জরুরী। (১৩ জুলাই, ২৪ ইং)
৩। আজ ১৬ জুলাই, ২৪ মুরাদপুর মোড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার উত্তাল বিক্ষোভ সমাবেশে আমি। ফুটওভার ব্রীজের সিড়িতে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ সমাবেশের ছবি বা ভিডিও করার সময় হঠাৎ মুরাদপুর মোড়স্থ বেলাল মসজিদ সংলগ্ল বিল্ডিয়ের ছাদ থেকে আন্দোলন প্রতিহতকারী টোকাইলীগের কর্মীরা বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতার ওপর ইট/পাটকেল নিক্ষেপ করলে উভয়পক্ষের নিক্ষিপ্ত ইট-পাটকেলের মাঝখানে পড়ে গেলে দৌঁড়ে আত্নরক্ষার চেষ্টাকালে পিছলে পড়ে বাম পায়ে আঘাত লাগে। ২-১টি ছোট্ট ইটের টুকরা গায়ে পড়লেও সৌভাগ্যক্রমে আজ বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি। পুলিশসহ সরকারি বাহিনার গুলিতে আজ কত জন মায়ের বুক খালি হয়েছে। (১৬ জুলাই,২৪ ইং)
৪। হ্রদয়ে রক্তক্ষরণ, না পারছি লিখতে, না পারছি কইতে, না পারছি শোক বইতে।
(১৭ জুলাই,২৪ ইং)
৫। শহীদ আবু সাঈদসহ কোটা সংস্কার দাবীতে সারাদেশে নিহত বীর ছাত্র-জনতার আত্মার মাগফেরাত/ মঙ্গল ও আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।
শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।সেইসংগে গণহত্যার ন্যায়বিচার করছি। (২৭ জুলাই, ২৪ ইং)
৬। গত ২৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের যৌক্তিক দাবীতে অহেতুক চকবাজার থানায় গ্রেফতার ভাগিনাসহ সহ তার ২ রুমমেইট। খবর পেয়ে অফিসে না যেয়ে সকালে চকবাজার থানায় উপস্থিত হয়ে এসিপি মাহমুদ সাহেব ও ওসি সাহেবকে তাদের অহেতু গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানিয়ে তাদের সুনিদির্ষ্ট কোন গুরুতর অভিযোগ না থাকলে সবাইকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়, মিথ্যা মামলা দিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত জীবন নষ্ট হুমকির মধ্যে ফেলে দেওয়া না সেই অনুরোধ জানিয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করেছিলাম । সেদিন থানায় আটক ২৫-২৬ জনের মধ্যে ২-৩ জন ছাড়া সবাইকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। ভাগ্য তাদের ভাল ছিল। দিনব্যাপি পরিশ্রম বৃথা যায়নি।
৭। গত ১৫ বছরে দেশে সবচেয়ে বেশী উচ্চারিত বিতর্কিত শব্দ "রাজাকার"। ছাত্ররা চাইলো অধিকার, রাতারাতি হয়ে গেলো রাজাকার। সরকারের সংগে থাকলে সঙ্গী আর বিরুদ্ধে গেলে জঙ্গী। ( ১ আগস্ট,২৪)
৮। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার ওপর আইনশৃংখলা বাহিনী পুলিশ ও সন্ত্রাসীর হামলা, মিথ্যা মামলায় গণগ্রেফতার, আন্দোলন দমাতে গুলি করে হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
আল্লাহ আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে হেফাজত করুন ( ৪ আগস্ট,২৪)
৯। দেশের ভূখণ্ড যেন একখন্ড ফিলিস্থিন।প্রতি দিন লাশের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। শিক্ষার্থী-জনতার ওপর পুলিশ-ছাত্রলীগের হামলায় গুলাগুলি,টিয়ার শেল,সাউন্ড গ্রেনেডের ভিডিও দেখলে মনে হয় নিজ দেশের ভূখণ্ড যেন একটি ফিলিস্থিন। No more shot by gun police. No more Jenocide.(৪ আগস্ট, ২৪)
পোস্ট ডিলেটের হুমকি: চবির এক সহকর্মী (শিক্ষক) ম্যাসেঞ্জারে আমাকে নানা প্রশ্নবানে জেরার এক পর্যায়ে বলেছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি আমি ছাড়া অন্য কেহ কোটা/ বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের পক্ষে পোস্ট দেয় নাই। অপর এক জুনিয়র সহকর্মী (ছাত্রলীগ নেতা) ম্যাসেঞ্জারে ফেসবুকে "ভাই, ওঠা কি আপলোড দিলেন, এখনই ডিলিট করেন, নয়তো সমস্যা হতে পারে "
অজানা শঙ্কা, পুলিশ পুলিশ আতঙ্ক : স্বৈরাচার সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত রাত কিংবা সাত সকালে কেহ একটু জোরে বাসার দরজা নক করলেই মনে হতো এ বুঝি 'পুলিশ বা আইন শৃংখলা বাহিনীর লোক, দরজা খুললেই বলবে আপনার বিরোদ্ধে অভিযোগ আছে, সঙ্গে আসুন বলে তুলে নিয়ে যাবে।
বার বার পোস্টকৃত স্ট্যাটাস কাটছাঁট: একটি স্মৃতি হলো স্টাটাস পোস্ট দিতে না দিতেই নানা অজানা আশঙ্কায় বারবার পোস্ট এডিট করে বারবার কাটছাঁট করতাম।
কর্মস্থলে বিপ্লবী ভুমিকার মূল্যায়ন: আন্দোলন সরাসরি অংশগ্রহণসহ ফেসবুকে প্রতিবাদী লেখালেখির বিষয়টি আমার আইডির যুক্ত থাকা সহকর্মীরা জানেন বিধায় দেখা হলে কেহ কেহ আমাকে 'বৈষম্য বিরোধী কলম সৈনিক'/ 'বৈষম্য বিরোধী একমাত্র চবি অফিসার' ইত্যাদি সম্ভোধনও করেন। ফেসবুক পোস্টেও এ ধরনের কমেন্টস করেছেন।
জুলাই মানে স্বৈরাচারের পতনধ্বনি। জুলাই স্মৃতি অমর হউক ।
লেখক: সহকারী রেজিস্ট্রার, কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ইই