নিজস্ব প্রতিবেদক
নানান বিতর্কের জেরে কক্সবাজারের চকরিয়া থানা থেকে বদলি হয়ে আসা হাটহাজারী থানার ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়া আবারও বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। হাটহাজারীতে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে স্কুলছাত্র তানভীর হত্যার ঘটনায় প্রকৃত আসামিদের আড়াল করা ও ভিকটিমের চাচাতো ভাইকে গ্রেফতার করে একাধিক মিথ্যা মামলায় আসামি করায় ওসির রহস্যজনক ভূমিকা সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, হাটহাজারী পৌরসভার আলীপুর রহমানিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানভীরকে কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসীরা গত ২১ অক্টোবর নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় হাটহাজারী মডেল থানা পুলিশ খুনিদের ধরতে টালবাহানা করে। প্রকৃত আসামিদের আড়াল করে এবং ভিকটিমের নির্দোষ চাচাতো ভাই মো. রায়হানকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করা হয়। এছাড়া একাধিক মামলায় আসামি করে দ্রুত আদালতে পাঠানো হয়। ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার এ রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে হাটহাজারীবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।
বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) ওসির বিতর্কিত ভূমিকার তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী হাটহাজারী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত আমীর অধ্যাপক শোয়াইব চৌধুরী ও সেক্রেটারি অধ্যাপক আব্দুল মালেক চৌধুরী।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, গত ২১ অক্টোবর হাটহাজারী পৌর এলাকায় কিশোর গ্যাং সন্ত্রাসীদের হাতে স্কুল শিক্ষার্থী তানভীর নৃশংসভাবে নিহত হয়। হাটহাজারী মডেল থানা থেকে মাত্র এক কিলোমিটারের মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলেও পুলিশ রহস্যজনকভাবে নিরব থাকে। কোনো আসামিকে গ্রেফতার না করায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে জনরোষের মুখে পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করে। এদের মধ্যে দুইজনকে ‘সন্দেহজনক আটক’ হিসেবে মিডিয়ায় প্রকাশ করা হলেও অপর একজনের নাম গোপন রাখা হয়।
অপরদিকে, নিহত তানভীরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সাইফুর রহমান তানভীরের মৃত্যুকে অসুস্থতাজনিত বলে প্রচার করেন এবং ‘অকাল মৃত্যু’ লিখে শোক ব্যানার টানানোর কারণে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে বুধবার অধ্যক্ষের অফিস ঘেরাও করে। পরে পুলিশ অধ্যক্ষকে থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বললেও এক পর্যায়ে দেখা যায়, পুলিশ তাঁকে থানায় নেয়নি। এ খবর জানতে পেরে নিহত তানভীরের চাচাতো ভাই ও হাটহাজারী কলেজ ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মো. রায়হান তার আরেক চাচাতো ভাই শরীফসহ থানায় যান এবং পুলিশের এসআই হাসানকে জিজ্ঞাসা করেন- “আপনারা অধ্যক্ষকে থানায় না এনে ছেড়ে দিলেন কেন?” তখন এসআই হাসান জানান, “অধ্যক্ষের দায়িত্ব আমাদের, তিনি পালিয়ে যেতে পারবেন না; যখন ডাকব, তখন তিনি চলে আসবেন।”
এরপর রায়হান পুলিশের গাড়িতে থাকা আটক তিনজনকে দেখে তাদের ছবি তোলেন। এসময় থানার সেকেন্ড অফিসার নাজমুল সাহেব রায়হানকে কড়া মেজাজে কথা বলেন, যার জেরে কিছু বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ রায়হানকে আটক করে থানার লকআপে নিয়ে যায়। মূলত নিহত তানভীরের চাচাতো ভাই মো. রায়হান পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকার বিষয়টি বুঝতে পেরে ওসির সাথে কথা বলতে বুধবার দুপুরে থানায় যান। তিনি দেখেন, থানা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আটক ব্যক্তিদের চেহারা গণমাধ্যম বা সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা হচ্ছে না এবং খুনিদের ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এই অবস্থায় রায়হান খুনিদের মুখের ছবি সংরক্ষণের চেষ্টা করলে থানার ওসি ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলার মিথ্যা অভিযোগ এনে গ্রেফতার দেখান। পরবর্তীতে তাঁকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকসু নির্বাচনের দিন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দ্বারা এসপির ওপর হামলার একটি মামলায়ও গ্রেফতার দেখানো হয়-যা প্রকৃত খুনিদের আড়াল ও নির্দোষ ব্যক্তিকে হয়রানির অপচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, চাচাতো ভাইয়ের হত্যার বিচার দাবিতে এগিয়ে আসা এক শিক্ষিত তরুণকে পুলিশ কর্তৃক এভাবে ফাঁসানো শুধু অমানবিকই নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিবৃতিতে তাঁরা রায়হানের নিঃশর্ত মুক্তি, তানভীর হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের কক্সবাজারস্থ স্টাফ রিপোর্টার সাংবাদিক মনসুর আলম মুন্নাকে কক্সবাজার শহর থেকে তুলে নিয়ে চকরিয়া থানা হেফাজতে আটক করে নির্যাতনের অভিযোগ ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে কক্সবাজার আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। এ বিষয়ে মনছুর আলম মুন্না বলেন, ওসি মনজুরের ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের ব্যাপারে সংবাদ প্রকাশ করায় ক্ষিপ্ত হন ওসি। এর জের ধরে গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে ৬০ কিলোমিটার দূরবর্তী চকরিয়া থেকে কক্সবাজার এসে তাকে অপহরন করে চকরিয়া থানায় নিয়ে যান ওসি মনজুর কাদের ভূইয়া। সারারাত মারধর ও নির্যাতন শেষে পরদিন ওসি নিজেই মামলা করে সাংবাদিক মনছুর আলম মুন্নাকে চালান দেন।
অন্যদিকে ভূক্তভোগী এক নারী ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে মধ্যরাতে বসত ঘরে ঢুকে যৌন নিপীড়ন শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নং ১ কক্সবাজার এ মামলাটি দায়ের করেন ভিকটিম জাহেদা বেগম। মামলার আরজিতে বাদী উল্লেখ করেন, ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়া চকরিয়া থানায় যোগদানের পর থেকে সাংবাদিকসহ বিভিন্ন স্তরের নীরিহ জনগনকে হয়রানি করে আসছেন। এর ধারাবাহিকতায় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তার দেবরকে আটক করে জামিনযোগ্য ধারায় চালান দেয়ার কথা বলে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন। কিন্তু ভিকটিম টাকা না দেয়ায় গভীর রাতে বসত ঘরে তার ঢুকে যৌন হয়রানি ও শ্লীলতাহানি করেন ওসি।
এছাড়া ঈদগাঁও উপজেলার বাসিন্দা আকতার হোছাইন নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে করেন। পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ছিলেন তৎকালীন ঈদগাঁও পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মনজুর কাদের ভূঁইয়া। বিগত ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাওলানা দেলাওয়ার সাঈদীর বিরুদ্ধে সাজানো রায়ের প্রতিবাদে ঈদগাঁও বাজারে জনগণ মিছিল বের করলে মিছিলে গুলিবর্ষন করেন মনজুর কাদের ভূঁইয়া। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন আকতার হোছাইনের ভাই রশিদ আহমদ। এ ঘটনায় মনজুর কাদের ভূঁইয়াকে ২ নম্বর আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়।
চকরিয়া থানা থেকে বিতর্কিত হওয়ার পর হাটহাজারীর নতুন ওসি হিসেবে মনজুর কাদের ভূঁইয়ার নাম সামনে এলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে প্রতিক্রিয়া জানান। বিভিন্ন পোস্টে তাকে ‘বিতর্কিত’ আখ্যা দিয়ে হাটহাজারীতে নিয়োগ না দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আগের কর্মস্থল চকরিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে হত্যা, নারী নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও হেফাজতে মৃত্যুর মতো গুরুতর সব অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। এসব অভিযোগে এর আগে তাকে প্রত্যাহারের দাবিতে সেখানে বিক্ষোভও হয়েছিল।
এমএইচএফ