আলমগীর মানিক, রাঙামাটি
নানা সমস্যা ও সংকট নিয়েই ধুকে ধুকে চলছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। দুর্গম এই জেলার শিক্ষার মান ও পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে বারবার হতাশার চিত্র ফুটে উঠলেও শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সংকট দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।
শিক্ষক সংকট, অবকাঠামো সংকট, আবাসন সংকট, যন্ত্রপাতি ও গবেষণাগারের (ল্যাব) সংকট, এবং অভিভাবকদের আর্থিক সীমাবদ্ধতাসহ সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে জনবলের তীব্র সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। সবচেয়ে বড় সমস্যা জেলার ১০টি উপজেলাতেই দীর্ঘ ২ বছরেরও বেশি সময় ধরে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের পদগুলো শূন্য রয়েছে। সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার রয়েছে মাত্র একজন। তিনি অনেকগুলো উপজেলায় ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এসব সংকটের কারণে প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসি ফলাফলে পিছিয়ে রয়েছে এ জেলার শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হারও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। জেলা সদরসহ উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুল থাকলেও প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। অবকাঠামোগত সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে রোদ বৃষ্টি মাথায় নিয়েই চলছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম। শিক্ষা সামগ্রীর ঘাটতিসহ আর্থিক অনটনের কারণেও শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
১০ উপজেলায় মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের ৭০টি পদের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৬০টি পদ খালি রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। রাঙামাটি জেলায় মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বমোট এক হাজার ৭৫১টি শিক্ষকের পদ রয়েছে। তারমধ্যে বর্তমানে এক হাজার ১৬৬ পদে কর্মরত থাকলেও আরো ৫৮৫টি পদ খালি রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলার মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সরিৎ কুমার চাকমা। তিনি জানান, বর্তমান সময়ে রাঙামাটির ১০ উপজেলায় উপজেলা শিক্ষা অফিসারের পদগুলো শূন্য।
জেলা শিক্ষা অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, রাঙামাটির মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে ইংরেজি বিষয়ে মোট পদের সংখ্যা ১৩৯; কর্মরত আছে ৯৪; খালি ৪৫। বিজ্ঞান বিষয়ে ২০১টি পদের মধ্যে ৭৫জন কর্মরত থাকলেও শূন্যপদের সংখ্যা ১২৬টি। গণিত বিষয়ের পদের সংখ্যা ১৩৬; কর্মরত আছে ১০৮; শূন্যপদ ২৮টি। অন্যান্য বিষয়ে সর্বমোট পদের সংখ্যা ১২৭৫টি। তার মধ্যে ৮৮৯টি পদে কর্মরত থাকলেও এখনো পর্যন্ত শূন্য রয়েছে ৩৮৬টি পদ।
রাঙামাটি সদর উপজেলায় মাধ্যমিকের জন্য সর্বমোট ৪১০টি পদের মধ্যে খালি পদের সংখ্যা ১০২টি। কর্মরত আছে ৩০৮টি পদ। বাঘাইছড়িতে ২৭৪ পদের মধ্যে কর্মরত আছে ১৯৪; খালি রয়েছে ৮০টি পদ। কাউখালীতে মাধ্যমিক শিক্ষকের পদ ২০৬টি, ১৩৩জন কর্মরত থাকলেও অত্র এখনো খালি পদের সংখ্যা ৭৩টি। বরকলে ১৩১ পদের মধ্যে ৭০টিতে কর্মরত থাকলেও খালি রয়েছে ৬১টি পদ। বিলাইছড়িতে ৩৪ পদে ১৫ টিতে কর্মরত থাকলেও খালি আছে ১৯টি। কাপ্তাইয়ে ১৯৩ পদের বিপরীতে কর্মরত ১২১ খালি রয়েছে ৭২ পদ। জুরাছড়িতে ৮৪ পদের মধ্যে ৬১টিতে কর্মরত থাকলেও খালি রয়েছে ২৩ পদ। নানিয়ারচরে ১৭২ পদের মধ্যে কর্মরত ১০৭ হলেও খালি রয়েছে রাজস্থলীতে ৬৫ পদের মধ্যে খালি রয়েছে ১৯; কর্মরত আছে ৪৬। লংগদু উপজেলায় ১৮২ পদের মধ্যে কর্মরত ১১১ হলেও খালি রয়েছে আরও ৭১টি শিক্ষকের পদ।
জেলার অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের অভাব সবচেয়ে বেশি। ফলে শিক্ষার্থীরা কোচিং বা প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাঙামাটিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৭০৭টি, এরমধ্যে ৩৯৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী শিক্ষকের তিন হাজার ৩৩৪টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ৫৭২টি।
এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে রাঙামাটির জেলা শিক্ষা অফিসার সরিৎ কুমার চাকমা জানান, বর্তমানে রাঙামাটিতে শিক্ষক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, আমাদের রাঙামাটিতে ৫০টি হাইস্কুল আছে। তারমধ্যে সরকারি রয়েছে ১১টি। এসব বিদ্যালয়গুলোতে অন্তত ২৫০টি স্থায়ী পদ সৃষ্টি দরকার। তিনি বলেন, পাহাড়ের দূর্গম এলাকাগুলোর মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষা মানোন্নয়ন করতে হলে শিক্ষকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির মতো করে অর্থ সহায়তা করা যেতে পারে, যাতে করে তারা অর্থকষ্টে পড়ালেখা থেকে ঝড়ে না যায়।
এছাড়া মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতনে ভালো মানের শিক্ষকদেরকে নিজ জেলার বাইরে শত কিলোমিটার শত মাইল দূরে বদলি করলে তারা কিভাবে চলবে; এই ক্ষেত্রে নিজ নিজ এলাকায় চাকুরির ব্যবস্থা করলে প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে সুশিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেছেন ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা অফিসার সরিৎ কুমার চাকমা।
ইই