আবু রুহামা
ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন উপমহাদেশের প্রতাপশালী নেতা। ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী কণ্ঠ হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল আকাশচুম্বী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুসলিম রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ফজলুল কাদের চৌধুরী বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির সমন্বয়ক ছিলেন। পাকিস্তান গঠন আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে হয়েছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের ৫ম স্পিকার। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নেতা হলেও চট্টগ্রামের প্রতি ছিল প্রবল টান। সুযোগ নিয়েই চট্টগ্রামের গণমানুষের জন্য বড় পরিসরে অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতকে ঢেলে সাজিয়েছেন তিনি আন্তরিকতা দিয়ে। বর্ষীয়ান এ রাজনীতিবিদের পরিবার আজও এ দেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক। তাঁর সন্তানরাও এদেশের জাতীয় রাজনীতিতে হয়ে আছেন প্রভাবশালী। তবে এই পরিবারের উপর দিয়ে গেছে নানা ট্র্যাজেডি। ফজলুল কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে কারাগারে। রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা অবস্থাতেই তাঁর সন্তান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ঝুলতে হয়েছে ফাঁসির দড়িতে। বর্তমানে রাজনীতিতে সক্রিয় অন্য সন্তান গিয়াস উদ্দিন কাদেরকেও মোকাবিলা করতে হচ্ছে নানা ষড়যন্ত্র।ফজলুল কাদের চৌধুরীর দৌহিত্ররাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত হয়ে উঠেছেন নানাভাবে।
চৌধুরীর রাজনীতিতে হাতেখড়ি ছাত্রজীবনেই: ১৯১৯ সালে চট্টগ্রামে রাউজানে জন্ম নেওয়া ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৯৪১ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম স্টুডেন্ট ফেডারেশনের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। এই সংগঠনের হয়ে ব্রিটিশ বিরোধী পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৫৪ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ফজলুল কাদের চৌধুরী ১৯৬৩ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার পদে অধিষ্ঠিত হন। আইয়ুব খান দেশ ছাড়ার সময় তিনি পাকিস্তানের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিও ছিলেন।
আইয়ুব খানের মন্ত্রিসভায় তিনি কৃষি ও পূর্ত মন্ত্রণালয়, শিক্ষা ও তথ্য মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। কনভেনশন মুসলিম লীগ (১৯৬২) গঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শুরুতেই তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি নিজ জেলায় বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজকল্যাণ এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (তৎকালীন আইটি) তাঁর নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী। এ কারণে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর বিভিন্ন সময় রাজনৈতিকভাবে এই পরিবারকে থাকতে হয়েছে সমালোচনার মুখে।
ফজলুল কাদের চৌধুরীর জন্ম চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার গহিরা গ্রামের বক্স আলী চৌধুরী বাড়িতে। তাঁর পিতার নাম খান বাহাদুর আব্দুল জব্বার চৌধুরী ও মাতার নাম বেগম ফাতেমা খাতুন। ফজলুল কাদের চৌধুরী কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে স্নাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএল ডিগ্রি লাভ করেন। পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকা অবস্থায় ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই হার্ট অ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হয়। ফজলুল কাদের চৌধুরীর চার সন্তান হলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, সাইফুদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামালউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তাঁর সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাংসদ ছিলেন। চট্টগ্রামপন্থি নেতা হিসেবে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুেদ্ধেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। বিএনপিতেও তিনি ছিলেন প্রভাবশালী। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর মুখরোচক বক্তব্যের জন্য তিনি বেশ পরিচিত।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা হয় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালীন নয় দিনের সাফাই সাক্ষ্যের পুরোটাই ইংরেজিতে দেন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। এ সময় নিজেকে বাঙালি নয়, চাটগাঁইয়া বলে দাবি করেন তিনি। ট্রাইব্যুনালের বিচারক তাকে বলেন, 'আপনি বাংলায় সাক্ষ্য দিলে এত সময় লাগত না। তার চেয়েও বেশি কথা বলতে পারতেন।' জবাবে সাকা চৌধুরী বলেন, 'আমি বাংলায় সাক্ষ্য দিতে পারবো না, ইংরেজিতেই দেব। কারণ, আমি বাঙালি না, চাটগাঁইয়া। বাংলায় তো আমি ভালো বলতে পারতাম না। টেকনিক্যাল প্রবলেম হতো।' এ সময় তিনি বলেন, 'আমার মাতৃভাষা বাংলা নয়, চাটগাঁইয়া।'
চট্টগ্রামের মানুষের কাছেও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছিল সমাদৃত ও গ্রহণযোগ্য নেতা। এ কারণে ছয় মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। চৌধুরী ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে ছয় মেয়াদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদ সম্পর্কিত কমিটির উপদেষ্টা ছিলেন।
সালাউদ্দিন কাদের ১৯৭৯ সালে রাউজান এবং রাঙ্গুনিয়া, ১৯৮৬, ১৯৯১ সালে রাউজান, ১৯৯৬, ২০০১ সালে রাঙ্গুনিয়া ও ২০০৮ সালে ফটিকছড়ি নির্বাচনী অঞ্চল থেকে পুননির্বাচিত হন। তাঁর প্রাথ মিক শিক্ষা শুরু হয় পাকিস্তানের সাদিক পাবলিক স্কুলে। পরবর্তীতে চট্টগ্রামের সেন্ট প্ল্যাসিডস হাই স্কুলে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকেই মাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেন। এরপর পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। চট্টগ্রামের রাউজানে ১৩ মার্চ ১৯৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ২০১৫ সালের ২১ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের বিতর্কিত রায়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী। তাঁর দুই ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও ফজলুল কাদের চৌধুরী এবং এক মেয়ে ফারজিন কাদের চৌধুরী। পিতার ফাঁসির পর হুম্মাম কাদের চৌধুরীর উপরও নেমে আসে রাজনৈতিক নিপীড়ন। ৭ মাস তাকে গুম করে রাখে আ.লীগ সরকারের একটি সন্ত্রাসী বাহিনী। হুম্মাম চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া আসন থেকে বিএনপি'র হয়ে সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ডানপন্থি ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী নেতা হিসেবে হুম্মাম কাদের বিভিন্ন জনসভায় বক্তব্য রেখে আলোচিত হন।
গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী:
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ( বিএনপি) প্রভাবশালী নেতা। তিনি ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৭আসন থেকে জাতীয় পার্টির প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন এবং ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সাবেক সাবেক সভাপতি।
রাউজানের রাজনীতিতে যুগের পর যুগ গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অবস্থান সুদৃঢ়। পাড়ায় পাড়ায় আছে তাঁর অগণিত অনুসারী, ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী। ভোটের মাঠে গিয়াস উদ্দিন কাদের নির্ভার। দক্ষিণ-পূর্বের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, আমার বাবা এ দেশের মাটি ও মানুষের উন্নতির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। এই চট্টগ্রামের মানুষকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালবেসেছেন। চট্টগ্রামের মানুষ আমার বাবাকে ভালবাসে। সন্তান হিসেবে আমরা বাবাকে রাজনৈতিক দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের প্রয়োজনে সকল কাজ সম্পাদন করতে দেখেছি। আমরাও সে পথ ধরে গোটা চট্টগ্রাম ও রাউজানের মানুষের জন্য কাজ করেছি। এ জনপদের মানুষের সঙ্গে আমাদের পরিবারের নাড়ির সম্পর্ক। জনগণের সুখ-দুঃখে পাশের থাকার এই ধারাবাহিকতা আমাদের অব্যাহত রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০০১ এর সাথে বিএনপির এখনকার অনেক পার্থক্য। এখন প্রযুক্তির যুগ। তরুণরা রাজনীতিতে এসেছে। তারা ভাল করছে। দলের বিষয়ে কিছুটা আক্ষেপ করে তিনি বলেন, আমার বড় ভাইকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে যে হত্যা করা হলো, সে বিষয়টি সেভাবে রিকগনাইজ করা হয়নি। সন্তানদের বিষয়ে তিনি বলেন, আমার ছেলে এখনই রাজনীতি করছে না। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবারের ছেলে হিসেবে সে ভবিষ্যতে কি করবে, তা আমরা বলতে পারি না। অনেক রাজনৈতিক নেতার সন্তানের ছেলে রাজনীতি করেনি। তারা কি তাদের বাবার লিগ্যাসি বহন করবে, তা ভবিষ্যতেও বলে দিবে।
রাজনীতিতে নেমে হুম্মাম কেমন করছে, এমন প্রশ্নের জবাবে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেন, এই যুগের ছেলেদের মূল্যায়ন করা কঠিন। তারা অনেক যোগ্য। আমি নিজের ছেলেকে মূল্যায়ন করতে পারিনা, ভাইপোর রাজনীতিকে কিভাবে মূল্যায়ন করবো। এই যুগের ছেলেদের চিন্তাভাবনাগুলো অনেক কঠিন। তবে ছেলে বা ভাতিজার কোনো প্রয়োজন হলে আমি তাদের পাশে দাঁড়াবো। বাবা হত্যার পর হুম্মাম ৭ মাস গুম ছিল। সে এখন মানসিকভাবে শক্ত আছে, এটিই আল্লাহর মেহেরবানী।
এমএইচএফ